নিজস্ব প্রতিবেদক:
কক্সবাজার শহরের ২নং ওয়ার্ডের উত্তর নুনিয়াছড়া এলাকার উচ্ছেদ আতংকে পড়া অর্ধশতাধিক পরিবার জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছে।
সাগরে মাছ আহরণ ও মাছের ব্যবসায় নিযুক্ত এই মানুষ গুলোকে পূনর্বাসন না করেই ‘জনবহুল’ এলাকাকে জনশূণ্য খাস জমি দেখিয়ে কোস্ট গার্ডকে জমি বন্দোবস্ত দেয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসি শতাধিক বছর ধরে বসবাসরত বাপ-দাদার ভিটায় তাদের বসবাসের অনুমতি দিয়ে কোস্টগার্ডকে অন্যত্র জমি বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।
রোববার (১৬ মার্চ) দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন এই স্মারকলিপি গ্রহণ করেছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
স্মারকলিপি প্রদান পরবর্তী এক ব্রিফিংয়ে এলাকাবাসিরা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় শত বছর ধরে ৫০টিরও বেশি পরিবার বসবাস করে আসছে। তারা বংশ পরম্পরায় এখানেই রয়েছেন। অথচ, ওই এলাকায় কোন মানুষের বসবাস নেই বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোস্ট গার্ড নিজেদের জন্য এক একর জমি বন্দোবস্তি নিয়েছে।
তারা বলেন, আমরা আমাদের জমিতেই থাকতে চাই। কোস্ট গার্ডের জন্য একই এলাকায় বহু খাস জমি পড়ে আছে। তারা সেখানে যেতে পারে। তারপরও যদি জোরপূর্বক আমাদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে তখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকা রয়েছে।
তাদের মতে, নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় সম্ভব সবটুকু করবে মানুষ।
অন্যদিকে রোববার রাতে উত্তর নুনিয়া ছড়া সমাজ কমিটি রাতে এলাকাবাসীদের মতবিনিময় সভা করেছে। সমাজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পুরো এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেয়া হয়েছে। ওই সভায় কয়েকটি এলাকাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, কয়েকশ লোক বর্তমানে উচ্ছেদ আতংকে রয়েছে। কোষ্ট গার্ড কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহের মধ্যে শত বছরের বাপ দাদার ঐতিহ্যবাহী ভিটা-বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিতে পারে বিধায় লোকজন আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। এই মুহুর্তে এসব লোকজন উচ্ছেদের কবলে পড়লে সবাই বিকল্প বাসস্থান সংকটের মুখে পড়বে। কেননা, সড়ক সংলগ্ন পূর্বদিকে কয়েকশত ফুট দৈর্ঘ্য এবং মাত্র ৬০/৭০ ফুট প্রস্থ এক একর জমি যেভাবে ট্রেস ম্যাপের মাধ্যমে কোষ্ট গার্ডকে খতিয়ানভূক্ত করে দেয়া হয়েছে তাতে এলাকাটির এক বিশাল অংশ অব্যবহৃতই থেকে যাবে।
স্মারকলিপি মতে, কক্সবাজার মৌজার ১১৪৪ নম্বর খতিয়ানের আর.এস ১৫১ দাগের ৪.৫০ একরের সম্পূর্ণ জমি আর.এস মূলে ব্যক্তি মালিকানাধীন। কিন্তু ভুলে এই পরিমাণ জমি বি.এস জরিপের সময় খাস খতিয়ানভূক্ত হয়ে যায়। ওখানকার বসবাসকারি লোকজনের বেশির ভাগই শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া। তাই জোত জমি খাসে পরিণত হলেও তারা সময়মতো আইন-আদালতের আশ্রয় নিতে পারেনি। বাঁকখালী নদীর তীরে কোষ্ট গার্ড একটি অফিস স্থাপনের জমি চাইলে ভূমি অফিসের লোকজন হয়তোবা যাচাই-বাছাই না করে অথবা সরেজমিনে না গিয়ে উত্তর নুনিয়াছড়া এলাকার নদীর তীর এবং রাস্তা সংলগ্ন পতিত খাস জমি বাদ দিয়ে একই এলাকার সংলগ্ন বসতবাড়িসহ এক একর জমি স্থানীয় বসবাসকারিদের অজান্তে কোষ্ট গার্ড কর্তৃপক্ষের নামে ট্রেস ম্যাপে প্রস্তাব দেয়া হয়। এমনকি বন্দোবস্তির পর ২০১২ সালে গোপনে এই জমি খতিয়ানভূক্ত করে নেয় বন্দোবস্তি গ্রহীতা কোষ্ট গার্ড কর্তৃপক্ষ।
প্রকৃতপক্ষে কোষ্ট গার্ডের নামে খতিয়ানভুক্ত জমি ওই এলাকার বর্তমান বাসিন্দাদের পূর্ব পুরুষের নামে ক্রয় করা সম্পত্তি। এমনকি ১৯৪৭ সালের ১০ জুন এই পরিমাণ জমি নগদপণে এলাকার বাসিন্দা মরহুম মোশারফ আলী, মরহুম আহামদ হোসেন, মরহুম আমির আলী, মরহুম জালাল উদ্দিন, আবুল হোসেন গং ক্রয় করে শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করে আসছেন। বর্তমানে ক্রয়সূত্রে বসবাস করছেন তাদের ওয়ারিশগণ। দীর্ঘকাল ধরে এই জমিতে বসবাস করাকালিন সময়ে সরকারি টেলিফোন, বিদ্যুৎ লাইন ব্যবহার করছেন তারা। সেই সাথে দীর্ঘকাল ধরে ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা হিসাবে ট্যাক্স দিয়েছেন এবং বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভার ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছেন।
স্মারকলিপিতে এলাকাবাসি উল্লেখ করেছেন, কোস্ট গার্ডের নামের নিজেদের বসতভিটা বন্দোবস্তি হওয়ার বিষয়টি ২০১২ সালে জানতে পারেন তারা। এরপরই তারা কক্সবাজারের বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানিয়ে অপর মামলা নম্বর-৫৭/২০১৩ইং দায়ের করেন। পরবর্তীতে উচ্ছেদ নোটিশ পেয়ে তারা নিশ্চিত হন, কোষ্ট গার্ডের জন্য এই জমি নেয়া হয়েছে।
তারা মনে করেন, জনবসতির পাশে অর্থাৎ বর্তমানে কোষ্ট গার্ডের জন্য খতিয়ানভূক্ত এক একর জমি সংলগ্ন উত্তর পাশে খালি জমিতে কোষ্ট গার্ডের অফিস হলে একটি ঘরও উচ্ছেদ করতে হবে না। আর খালি এই জমিটির পশ্চিমে সড়ক এবং পূর্বে বাঁকখালী নদী। পুরো জমিটিই চমৎকার অবস্থানে রয়েছে।
তাদের দাবি, শত বছরের বাড়ি-ভিটা উচ্ছেদ না করে কোষ্ট গার্ডের নামে বন্দোবস্তিপূর্বক খতিয়ান সৃজন করা এক একর জমির ট্রেস ম্যাপটি সংশোধন, অথবা কোষ্ট গার্ডকে দেয়া বন্দোবস্তি বাতিল করে পূণরায় একই স্থানের খালি জায়গাটি দিয়ে অর্ধশতাধিক বসতভিটার বাসিন্দাদের রক্ষা করা হোক।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন আবুল বশর, জাহাঙ্গীর আলম, এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন, রেজাউল করিম, ফরিদুল আলম, নুরুল বশর, আবদুল খালেক, কুতুব উদ্দিন, এডভোকেট মনির উদ্দিন, আব্দুল মান্নান, মোহাম্মদ সুলতান লালু, লুৎফুর রহমান খোকা, হেলাল উদ্দিন, সৈয়দ হোসেন প্রমুখ।