এম আর আয়াজ রবি,কক্সবাজার:
সম্প্রতি মাননীয় হাইকোর্ট বেঞ্চ জানতে চেয়েছেন-সারা দেশে কতজন রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ৮ আগস্ট-২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ইতিপুর্বে, কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও উপজেলার ঈদগাঁও ইউনিয়নে রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ না দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদটির নির্বাচনের তফসিলের বৈধতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হামিদ হাইকোর্টে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ২৪ এপ্রিল হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। পুরো কক্সবাজার জেলায় কতজন রোহিঙ্গাকে ভোটার করা হয়েছে, তা তদন্ত করে ৬ জুন আদালতে প্রতিবেদন দিতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার সচিব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঐ রিটের ধারাবাহিকতায় সারা দেশে কতজন রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা চেয়ে গতকাল (১১-জুন-২৪) সোমবার ওই আবেদন করে রিট আবেদনকারীপক্ষ।
মিয়ানমারের রাখাইনে ব্যাপক সহিংস ঘটনার জেরে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে একপ্রকার জোরপুর্বক বাস্তুচ্যুত লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে সীমান্তবর্তী উখিয়া টেকনাফে অনুপ্রবেশ করে। বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প ও হাতিয়ার ভাসানচরে আশ্রয় দেওয়া হয় এই রোহিঙ্গাদের।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত ‘ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ’ (আইএসসিজি)। এদের সর্বশেষ হিসাবমতে, উখিয়া টেকনাফ ও ভাসানচরে অবস্থিত ৩৪টি ক্যাম্পে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা ৯ লাখ ৫ হাজার ৮২২ জন। এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে ১৯৯১ সালে আসা ৩৪ হাজার রোহিঙ্গাও। বাকি ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কোথায় গেছে, তা কারও জানা নেই। তবে সরকারি-বেসরকারি সব মহলই মনে করছে, এসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলাসমুহ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-রাজশাহী, সিলেটসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলাশহরসহ বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে।
উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাঁটাতারের বাইরে পালংখালী ইউপির থাইংখালীর তেলখোলা, মোচারখোলা, আনজুমারপাড়া, বালুখালী, রাজাপালং ইউপির কুতুপালং এর হাজম রোড, ধলিয়াঘোনা, মনচানোর ঘোনা, লম্বাঘোনা, টিএন্ডটি, মইজ্ঞাবর কাটা, হাতিমোড়া, ঢেইলপাড়া, চাকবৈঠা, ফলিয়া পাড়া, মাছকারিয়া, শীলেরছড়া, হাজিরপাড়া, দোছড়ি, খয়রাতিপাড়া, হরিণমারা, পুকুরিয়া, জামতলী, হলদিয়া ইউনিয়নের পাতাবাড়ি, পাগলীরবিল, কেলাসীপাড়া, রত্না ইউনিয়নের ভালুকিয়া, হারুন মার্কেট, জালিয়াপালং ইউপির শাপলাপুর, শফিরবিল, ইনানী, সোনাইছড়ি, সোনারপাড়া, পাইন্যাশিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে খাস ও রিজার্ভ বনভুমির পাহাড়, টিলা ও সমতল দখল করে শত শত রোহিঙ্গা নানা ছদ্মবেশে বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বাইরে এসে কৌশল করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, জালিয়াপাড়া, নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু, চাকঢালা, সোনাইছড়ি, মহেশখালী, কুতুবদীয়া, চকরিয়া, ঈদগাও, রামুসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা বলে স্থানীয়দের দখলে থাকা খাস ও বনভুমির রিজার্ভ জায়গা নানা ছলে বলে কৌশলে প্রথমে একজন ক্রয় করে। পরে ধীরে ধীরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আত্মীয় পরিজন যেমন, ছোট ভাই, ছোট বোন, শ্যালক-শ্যালিকা, মামাতো ভাই, চাচাতো ভাই প্রভৃতি পরিচয়ে এক একটা পরিবারের সদস্যকে ক্রয়কৃত স্থানে নিয়ে এসে বসতি স্থাপন করে। অনেকেই বিভিন্নভাবে নামে বেনামে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে। এসব জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করারক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধির বিভিন্ন স্তরের সুবিধাভোগী লক্ষ লক্ষ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দিয়েছেন। অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র করতে পারেন নি, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিভিন্নজনকে নিজেদের বাংলাদেশী বুনে যাবার প্রানান্ত চেষ্টা করছে। অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দিনের বেলায় বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অনুদান সংগ্রহ করার জন্য অবস্থান করলেও রাতের বেলায় ক্যাম্পের বাইরে তাদের নিজস্ব বসতিতে কাটায়।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ডেলিগেট উখিয়া শাহপুরী হাইওয়ে এর পাশ্ববর্তী হাজম রাস্তার মাথায় মুজিব বর্ষের আশ্রয়ন প্রকল্প পরিদর্শনে আসেন। তারই সুবাদে অত্র প্রতিবেদক মুজিব বর্ষ আশ্রয়ন প্রকল্পের আশে পাশে বিভিন্ন অবৈধ বসতি স্থাপনের চিত্রচোখে পড়লে সেসব বসতিতে কারা বসবাস করেন এরুপ একটি অবজার্ভেশনে কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে- যা রীতিমতো ভয়ংকর,আত্মঘাতি, এবং জাতীয় নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গভীর উদ্বেগজনক !
উখিয়া সদর ইউপি’র হাজম রাস্তার মুখে, ছোট বাজারের একটু পরে পাহাড়ের ঢালুতে ৫০ কড়া জায়গা ক্রয় করে বসতি স্থাপন করেন ফখরুল ইসলাম (৪০) নামক এক পুরনো রোহিঙ্গা। তিনি অত্র প্রতিবেদককে-নিজেকে তুমব্রু ৪ নং ওয়ার্ড থেকে এসে এখানে অবস্থান করছেন বললেও, তিনি কিন্তু পুরনো রোহিঙ্গা। ৯০ দশকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। তারভাষ্য মতে- তিনি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। তিনি পেশায় একজন ফার্মাসিষ্ট ও শল্য ডাক্তার পরিচয় দেন। তার ডাক্তারী ও ফার্মেসী করার কোন সনদ, লাইসেন্স ও অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে আমতা আমতা করেন। তিনি সেমি পাকা ঘর করে স্ত্রী, সন্তানসহ সেই ঘরে অবস্থান করেন। পাশেই চার রুমের দোকান ঘর ভাড়া দিয়েছেন। একটাতে তিনি ফার্মেসীর দোকান করেন, অন্যগুলো ভাড়া দেন। তার ৫ সন্তান। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন,অন্য ছেলে ৭ম শ্রেণিতে পড়েন বলে জানান। ছোট সন্তানগুলো স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফখরুলের সাথে তার শ্যালিকা-জামাই, বউ এর বড় বোন-জামাই বসবাস করেন। তারা সবাই রোহিঙ্গা কিন্তু রীতিমতো বাংলাদেশী হয়ে আছেন। ফখরুলের বিরুদ্ধে কোন মামলা আছে কিনা জানতে চাইলে প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে প্রতিবেদকের কাছে তথ্য, উপাত্ত আছে বললে তিনি মামলার কথা স্বীকার করেন। বনবিভাগের একটা মামলা ও চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে একটা মারামারির মামলা রয়েছে তিনি স্বীকার করেন। যদিওবা ফখরুলের বিরুদ্ধে ইয়াবাসহ খুনের মামলা রয়েছে বলে পার্শ্ববর্তী স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।
হাজম রাস্তার একটু পরে একটি মাজার রয়েছে। ঔ মাজারে আছেন একজন খাদেম। উনাকে স্থানীয়রা ইয়াবা আলী বলে জানেন। উনি স্থানীয় হলেও বউ, শ্যালক-শ্যালিকা সবাই রোহিঙ্গা, থাকেন একই বাড়িতে। সবাই ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত বলে জানা যায়। মাজার ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা ক্রয় বিক্রয়, মজুদ করেন বলে স্থানীয়দের অভিমত। তার বউ, শালা শালী, ভাগিনা সবাই রোহিঙ্গা। সবাই ইয়াবা কারবারি। আলীর বিরুদ্ধে একাধিক ইয়াবা মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
হাজম রাস্তার ভিতরে পলাশের ঘোনার পাহাড়ের ঢালুতে সেমি পাকা বাড়ি তৈরি করে অবস্থান করেন, রোহিঙ্গা নেতা আইয়ুব। তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক আলীক্বীন গ্রুপের বড় নেতা। দিনের বেলায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করলেও রাতের বেলায় তার নিজস্ব তৈরি করা সেমি পাকা ঘরে অবস্থান করেন। আয়ুবের হাজম রাস্তায় আস্তানা গাড়ার কারণ অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে চমকপ্রদ তথ্য। মনোয়ারা মনু নামক উখিয়া সদর ইউনিয়নের হাজীর পাড়া এলাকার বাসিন্দা জনৈক রোহিঙ্গা সৈয়দ হোসেনের সাথে তার বিয়ে হয়। সৈয়দ হোসেনের আপন বোনকে বিয়ে করেন আলীক্বীন নেতা আইয়ুব আলী। মনোয়ারা মনুর শক্তি বৃদ্ধির জন্য তারই হেফাজতে আলীক্বীন নেতা আইয়ুবকে জায়গা কিনে দেন তিনি। প্রশাসনিক জটিলতা ও সংবাদ মাধ্যমে আলীক্বীন আইয়ুবের ব্যাপারে প্রতিবেদন হওয়ায় প্রশাসনের নজরে আসায় ঘর তৈরিতে বাধা প্রদান করেন উখিয়া প্রশাসন। কিন্তু গত ২৯-শে মে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিন সদলবলে বাড়ির ছাউনীসহ ঘর তৈরি সম্পন্ন করেন। এখন তারা সপরিবারে ঐঘরে অবস্থান করছেন। অত্র প্রতিবেদক ঐ ঘর পরিদর্শনে গিয়ে আইয়ুবের পরিবারকে দেখা পাওয়া যায়নি। তবে রোহিঙ্গা শ্রমিক ঘরের আঙিনায় ও বাসা বাড়িতে কাজ করতে দেখা যায়। অবশ্য রাস্তার ঔপাশে মনোয়ারা তার রোহিঙ্গা হাসবেন্ড সৈয়দ হোসাইনকে নিয়ে বসবাস করছেন। সৈয়দ হোসাইনের নামে ৪টিরও বেশি ইয়াবা মামলা আছে বলে স্থানীয়রা জানান।
ইউনুছ ফকির দরবারের ইউনুছ ফকির, ছেলে আলী জুহার, ভাগনী নাজমা ও জামাই শফিসহ সবাই ইয়াবা বেপারি। প্রত্যেকের একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
আমির হোসেন ফাতের বাড়ির পাশে বসবাস করেন চিহ্নিত মানব পাচারকারি খলিফা জাহাঙ্গীর।সময় অসময়ে তিনি মালয়েশিয়ায় লোক ধরে ট্রলারে তুলে পাচার কাজে সহযোগিতা করে বলে স্থানীয়রা জানান।
হাজম রাস্তার পাশেই ইদ্রিস, তার মা, বোনসহ ৪ টি ঘর রোহিঙ্গা পরিবার। স্থানীয়দের মতে, তারা নামে বেনামে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে রীতিমতো স্থানীয় সেজে গেছে।
পলাশের তলী নামক স্থানে বসবাসকারী বুড়োসহ পাশের ৩টি বাড়ী রোহিঙ্গাদের। তারা বরাবরই স্থানীয় দাবি করে কিন্তু কোন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না বলে স্থানীয়রা জানান।
হাজম রাস্তার অন্যপাশে নুরুল ইসলাম নামক একজন আছেন যিনি ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। তার নামে চারের অধিক বিভিন্ন মামলা রয়েছে বলে জানা যায়। তার সাথে রয়েছে হেলাল, বেলাল ও বোনের জামি ফরিদ। তারা সবাই মিলেমিশে ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। এটা গেল শুধুমাত্র উখিয়া সদর রাজা পালং ইউপির হাজম রাস্তার মাথায় গড়ে উঠা রোহিঙ্গা পল্লীর কিছু চিত্র। এভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে উখিয়া উপজেলার আনাচে-কানাচে, কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলাসহ বিভাগীয় শহর গুলোতে রোহিঙ্গারা বিভিন্নভাবে নামে-বেনামে বা ছদ্মবেশে কত রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন তার কোন ইয়াত্তা নেই।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার পেছনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ সদস্য, নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মাঠপর্যায়ের দালাল চক্র জড়িত। এর জন্য ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ১২টি স্তরে এই অর্থ ভাগাভাগি হয়।
গনমাধ্যমের অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে জালিয়াতি করে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের এনআইডি পেয়েছে। অর্থাৎ ৪০ ভাগের মতো রোহিঙ্গার হাতেই এখন এনআইডি রয়েছে। আর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাইয়ে দিয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পকেটে ভরেছে এই চক্র। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ কয়েকটি স্থানে সরেজমিনে গিয়েও এসব তথ্যের সত্যতা মিলেছে। এই প্রতিবেদক কয়েকজন দালাল এবং জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি ও পাসপোর্ট করিয়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা কীভাবে এসব অপকর্ম করেছেন তার ফিরিস্তিও দিয়েছেন তারা।
রোহিঙ্গারা জানায়, আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে ভিন্ন কোনো দেশে চলে গেছে। কেউ আবার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা করছে।
দালাল চক্রের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের জড়িত থাকারও তথ্য মিলেছে।
এ দালালদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজনের সঙ্গে রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করলে অত্র প্রতিবেদক রোহিঙ্গা ভাষায় হুবহু কথা বলতে না পারায় তিনি ঝামেলা আঁচ করতে পেরে কথা বলা বন্ধ করেন। পরে রোহিঙ্গা ভাষার সাথে মিল আছে এরকম স্থানীয় এক ব্যক্তির সাথে কথা বললে সেই দালাল জানান, রোহিঙ্গাদের জন্মসনদ, এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করে দিতে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এই টাকার ভাগ পান জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্ট, নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসনের লোকেরা। সব টাকা প্রথমে দালাল নেন। তার কাছ থেকে ভাগ হয়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ চলে যায় জিম্মাদার, কাউন্সিলর ও তার ব্যক্তিগত সচিব (পিএস), ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান, ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্ট গ্রহণকারী নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনদাতা, রোহিঙ্গা নয় এমন প্রত্যয়নপত্র ও ভূমি সনদের প্রত্যয়নপত্র যারা দেন তাদের কাছে।
রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রতিবেদককে অবহিত করেছেন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত এক দালাল। তিনি অত্র প্রতিবেদককে বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট পাওয়া স্থানীয়দের চেয়ে সহজ। কারণ রোহিঙ্গারা চুক্তি করেই পাসপোর্ট করে। ধরা যাক, কোনো রোহিঙ্গা পাসপোর্ট করতে এসেছে। সে যখন কোনো দালালের মাধ্যমে অনলাইনে ফরম পূরণ করবে সঙ্গে সঙ্গে ফরমটির ছবি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাসপোর্ট অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে চলে যাবে। সেই পাসপোর্ট যাচাই করবেন কোন কর্মকর্তা খবর রাখবে দালাল চক্রটি। সেই কর্মকর্তাকেও টাকা দেওয়া হয়। কক্সবাজারে পাসপোর্ট পেতে সমস্যা হলে বান্দরবান বা চট্টগ্রাম পাসপোর্ট অফিস থেকে নেওয়া হয়।
এত টাকা রোহিঙ্গারা কোথায় পায় এমন প্রশ্নের জবাবে একটি দালাল চক্রের প্রধান বলেন, যেসব রোহিঙ্গা এনআইডি কিংবা পাসপোর্ট করায় তাদের অধিকাংশই মাদক, অস্ত্র পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িত। এ ছাড়া অনেক রোহিঙ্গার স্বজন বিদেশে রয়েছে কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাদের অর্থের অভাব হয় না।